নদীর ইলিশ পুকুরে চাষের স্বপ্ন দেখছেন গবেষকরা

প্রকাশিত: ১৩-০৯-২০১৮, সময়: ০৬:১৪ |
খবর > জাতীয়
Share This

সম্প্রতি ইলিশের পূর্ণাঙ্গ জীবনরহস্য উন্মোচন করেছেন ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি) ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের গবেষকরা। এই গবেষক দল দু’টির দাবি, এই মুহূর্তে ইলিশের জীবনের গতিপথ ও বিচরণের রহস্য উন্মোচন সম্ভব হয়েছে। আর এর মাধ্যমে জানা যাবে, কীভাবে ইলিশের স্বাদ ঠিক রেখে সব গুণাগুণসহ উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব। এই গবেষণার পর গবেষকরা পুকুরে ইলিশ চাষের দেখছেন। অবশ্যই পুকুরে ইলিশ চাষের সম্ভাবনা  নিয়ে ১৯৮৮ সাল থেকে চার ধাপে গবেষণা করেছে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট। তবে ওই গবেষণায় পুকুরে ইলিশ চাষে সফলতা আসেনি। এই প্রসঙ্গে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট বলছে, আরও গবেষণা করলে হয়তো পুকুরে ‘সৌখিনভাবে’ ইলিশ চাষ সম্ভব হবে, কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে নয়। এদিকে, জিনোম সিকোয়েন্সিং অ্যান্ড অ্যাসেম্বলি টিমের সমন্বয়ক ও বাকৃবির ফিসারিজ বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সামছুল আলমের মতে, গবেষণায় যে তথ্য পাওয়া গেছে, তারই আলোকে এখনই পুকুরে ইলিশের চাষের স্বপ্ন দেখা ভুল হবে।

প্রসঙ্গত, ইলিশ জিনোম গবেষণার মাধ্যমে এর জীবনরহস্য উদঘাটিত হয়েছে বলে গত ৮ সেপ্টেম্বর (শনিবার) এক সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) মৎস্য বিজ্ঞানীরা। এই গবেষণাটি দীর্ঘ তিন বছরের ধরে করা হয়েছে। গবেষণা টিমের সমন্বয়ক ও ফিসারিজ বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সামছুল আলমসহ চারজন রয়েছেন এই টিমে।  এই গবেষক দলের মতে, ইলিশের জীবনরহস্য উন্মোচন হওয়ায় বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ইলিশের ওপর কী প্রভাব পড়ছে এবং এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে খুব দ্রুত জানা যাবে। এছাড়া পরিবর্তনশীল পরিবেশে ইলিশ মাছকে খাপ খাওয়ানোর জন্য উপযোগী জিন ভবিষ্যতে আবিষ্কার করা সম্ভব হবে।

এছাড়া ড. মং সানু মারমা’র উদ্যোগে ইলিশের ইলিশের জীবনরহস্য উদ্‌ঘাটনের গবেষণা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হাসিনা খানসহ পাঁচ গবেষক।  এই গবেষক দলের গবেষণা সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন গত ৮ সেপ্টেম্বর দুটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হয়।  তাদের মতে, মিষ্টি পানিতে মাছ যখন যায়, তখন সে কোন প্রোটিন তৈরি করছে, সেই মাছ লোনা পানিতে গেলে কোন প্রোটিন তৈরি করে, সেটা খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তখন এই গবেষণায় খুঁজে বের করার চেষ্টা করা হবে, কোন প্রোটিন তাকে দেওয়ার প্রয়োজন, যে প্রোটিন পেলে সে মিষ্টি পানিতেই থাকতে পারবে।

এদিকে, ১৯৮৮ সালে সরকারি অর্থায়নে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, নদী কেন্দ্র, চাঁদপুরের দুটি পুকুরে ইলিশ চাষের প্রথম উদ্যোগ নেয়। কিন্তু সে সময় ব্যর্থ হওয়ায় ১৯৯৫ সালে সেই প্রকল্প বাতিল করা হয়। এরপর ২০০৪-০৫ অর্থবছরে পুকুরে ইলিশ চাষ বিষয়ে গবেষণা হয়। কিন্তু তখনও তেমন সফলতা আসেনি। এরপর ২০১০-১১ এবং ২০১২-১৩ অর্থবছরে ‘জাটকা সংরক্ষণ, জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান ও গবেষণা’ প্রকল্পের অধীনে গবেষণা শুরু হয়। তখন গবেষণার জন্য নদী-সাগর থেকে ৮-১২ সেন্টি মিটার সাইজের ২ হাজার ২০০ ইলিশের পোনা সংগ্রহ করে ইনস্টিটিউটের ৩টি পুকুরে ছাড়া হয়। এর একবছর পর মাছগুলো পরীক্ষা করে দেখা যায়, মাছের বৃদ্ধির হার খুবই কম। ডিমগুলোও অপরিপক্ব। পরবর্তী সময়ে ২০১৫-১৬ সালে ওয়ার্ল্ড ফিস সংস্থার ইকোফিশ প্রকল্পের অধীনে ইউএসএইডের অর্থায়নে আবারও গবেষণা শুরু হয়। কিন্তু সেটিও সফল হয়নি।

প্রসঙ্গত, চাঁদপুরে পুকুরে ইলিশ চাষের এই গবেষণা প্রকল্পে ৭ জন গবেষক ও ৪ জন গবেষণা সহকারী রয়েছেন।.

ইলিশ গবেষক ড. আনিছুর রহমান

জিনোম সিকোয়েন্সিং অ্যান্ড অ্যাসেম্বলি টিমের সমন্বয়ক ও বাকৃবির ফিসারিজ বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. সামছুল আলমের কাছে জানতে চাইলে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘এখন আমরা যে গবেষণা করেছি, তা যদি প্রয়োগ করা না হয় তাহলে মানুষের কোনও কাজে আসবে না। তবে আমরা এখন পর্যন্ত স্পষ্ট হয়েছি, আমাদের গবেষণায় পাওয়া তথ্য প্র্যাকটিক্যালি যদি অ্যাপ্লাই করা যায়, তাহলে স্বাদ ও মান ঠিক রেখে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি করা সম্ভব। যেমন, নদীতে যেক’টি অভয়াশ্রমে ইলিশ বিচরণ করে, সেখানে বর্তমান পরিবেশে যেসব খাদ্য উপাদানের কারণে ইলিশ উৎপাদিত হয়, সেসবের ব্যবহার করে এই মাছের উৎপাদন বাড়ানো  সম্ভব।।’ তিনি আরও বলেন, ‘এই অভয়াশ্রমগুলোকে আরও বৈজ্ঞানিকভাবে উন্নতিকরণের মধ্য দিয়ে মাছের উৎপাদন করা সম্ভব, সেটা এখন বলা সম্ভব। কিন্তু কেউ যদি মনে করেন, এই গবেষণার মাধ্যমে ইলিশ পুকুরেও চাষ করা সম্ভব, তাহলে সেটা ভুল হবে। কারণ, ইলিশ সমুদ্র ও নদী দুই জায়গাতেই আশ্রয় নেয়, ডিম পাড়ে বড় হয়। তার বাসস্থান সেখানেই, তাকে সেখানেই মানায়। তবে পুকুরে চাষ করা সম্ভব কিনা, এটা এখনই বলা যাবে না। এর জন্য আরও গবেষণার প্রয়োজন। আমরা সে চেষ্টা করতে পারি।’

এই গবেষকদলের অন্য এক সদস্য বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ইলিশের জীবনরহস্য উন্মোচন হওয়ায় বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ইলিশের ওপর কী প্রভাব পড়ছে, এর ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে খুব দ্রুত জানা যাবে। এছাড়া পরিবর্তনশীল পরিবেশে ইলিশ মাছকে খাপ খাওয়ানোর জন্য উপযোগী জিন ভবিষ্যতে আবিষ্কার করা সম্ভব হবে। আর এই জিন আবিষ্কার সম্ভব হলেই পুকুরে ইলিশ চাষ করা যাবে কিনা, তা নিয়েও কাজ করা যাবে।’

ইলিশের জিনোম বিন্যাস উদঘাটনে পৃথক একটি গবেষণার নেতৃত্ব দিচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ রসায়ন ও অণুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হাসিনা খান। জানতে চাইলে বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘গবেষণা তো মাত্র শুরু। এখনও অনেক পথ এগোতে হবে। এখন শুধু আমরা একটি রেফারেন্স উদঘাটন করেছি। এখন যে তথ্য পেয়েছি, ইলিশ কোন পরিবেশে কীভাবে বসবাস করে, কোন ধরনের পরিবর্তনের কারণে তার স্বাদ পাল্টায়, কোন পরিবর্তনের জন্য তার উৎপাদন বৃদ্ধি বা হ্রাস হয়, এগুলো আমরা খুঁজে বের করেছি। এরপর এই সূত্রগুলো ব্যবহার করে পরবর্তী সময়ে উপযুক্ত পদ্ধতি খুঁজে বের করবো। মাছকে কোন পরিবেশ দিতে পারলে তার উৎপাদন বাড়বে এবং  স্বাদ নষ্ট হবে না, তা আবিষ্কারের চেষ্টা করবো।’ তিনি আরও বলেন, ‘মিষ্টি পানিতে মাছ যখন যায়, তখন সে কোন প্রোটিন তৈরি করে, আবার সেই একই মাছ লোনা পানিতে গেলে কোন প্রোটিন তৈরি করে, কোন প্রোটিন তাকে দেওয়ার প্রয়োজন, কোন প্রোটিন পেলে মাছটি মিষ্টি পানিতেই থাকতে পারবে, আমরা তা অনুসন্ধান করছি। এসব তথ্য জানা গেলে পুকুরে ইলিশ চাষ সম্ভব কিনা, তাও জানতে পারবো।’

পুকুরে ইলিশ চাষের সম্ভাবনা বিষয়ে জানতে চাইলে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ইলিশ গবেষক ড. আনিছুর রহমান বলেন, ‘আমরা ২০১০-১৩ অর্থবছরে নদী ও সাগর থেকে ৮-১২ সেন্টিমিটার সাইজের ইলিশের পোনা এনে ইনস্টিটিউটের পুকুরে ছাড়ি। একবছরের মধ্যে ওই মাছগুলো বেড়ে প্রায় ৩০০ গ্রাম হয়। এই বৃদ্ধির হার খুবই কম। এ সময়টায় নদী ও সাগরে থাকলে ইলিশগুলোর ওজন হতো ৪৫০ থেকে ৫০০ গ্রাম। এছাড়া গবেষণার সময় পুকুরে থাকা মাছের পেটের ডিমও আমরা দেখি। কিন্তু পরীক্ষা করে দেখা যায়, ডিমগুলো অপরিপক্ব। নদী ও সাগরের মাছের ডিমের তুলনায় এই ডিমগুলো একধাপ পিছিয়ে থাকে। বদ্ধ জলাশয় বা পুকুরে ইলিশ চাষের ক্ষেত্রে পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, পুকুরের চাষ করা ইলিশ সম্পূরক খাবার খায় না। প্রাকৃতিক খাবার খায়। এছাড়া বদ্ধ জলাশয়ে খাদ্য ও পানির গুণাগুণ ধরে রাখা খুব কঠিন।’

আনিছুর রহমান বলেন, ‘ওই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে পরবর্তী সময়ের গবেষণায় পুকুরের ইলিশগুলোকে প্রাকৃতিক খাবার তৈরি করে দিয়ে দেখেছি। এর ফলে আগের চেয়ে কিছুটা ভালো হলেও তা বাণিজ্যিকভাবে চাষ করার মতো নয়। বাণিজ্যিকভাবে চাষ করতে হলে আরও ব্যাপক গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। তবে, পুকুরে ইলিশ চাষ একেবারেই অসম্ভব তা বলবো না।’

Comments

comments

Leave a comment

ফেসবুকে আমরা

লেখা পাঠান

আপনিও লিখতে পারেন। হতে পারেন আপনার জেলা কিংবা উপজেলার প্রতিনিধি।

সিভি পাঠান


news@digitalbangla24.com

সর্বশেষ সংবাদ

উপরে