প্রযুুক্তির প্রভাবে নির্বাচনী প্রচারে পরিবর্তন

প্রকাশিত: ২২-১১-২০১৮, সময়: ১২:৫৭ |
Share This

যুদ্ধে নামার আগে সৈনিকদের প্রশিক্ষণ চলছে, কিন্তু লোকচক্ষুর আড়ালে। সংবাদ মাধ্যমের আর সাধারণ মানুষের নজর থেকে অনেক দূরে, পশ্চিমবঙ্গের জেলায় জেলায় এই যোদ্ধাদের জন্য  প্রতি মাসে অন্তত দু’টি করে প্রশিক্ষণ শিবিরের আয়োজন করছে ভারতের  ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল বিজেপি।

এই যোদ্ধাদের হাতে কিন্তু গোলা-বন্দুক নেই, আছে স্মার্টফোন। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে নরেন্দ্র মোদিকে আবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী বানানোর লক্ষ্যে এভাবেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সৈনিকদের প্রশিক্ষণ শিবির চালাচ্ছে বিজেপি।

এমনি এক শিবিরে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি অমিত শাহ সম্প্রতি বলেন, সামজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় না হয়ে নির্বাচন জেতা অসম্ভব।

নাম দেওয়া হয়েছে ‘সেল ফোন প্রমুখ’। সারাদেশে প্রায় ৯ লাখ সৈনিক, যার অর্থ দেশের প্রত্যেক বুথের জন্য একজন তৈরি  করে  লোকসভা নির্বাচনের আগে হোয়াটসআপ ব্যবহার করে ভোটারের  কাছে পৌছে যাওয়ার পরিকল্পনা  করে মাঠে নেমেছে  বিজেপি।

‘ভারতে ২০১৪ সালের নির্বাচনে নরেন্দ্র  মোদির যে উত্থান হয়েছিল, তার এক অন্যতম কারণ ছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার। আগামী  বছরের লোকসভা নির্বাচনের আগে আরো বাড়বে এই মাধ্যমের ব্যবহার’, বলেছেন এক রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

ভারতের টেলি-যোগাযোগ দপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশের  প্রায় ১১০কোটি  মানুষের সেলফোন  রয়েছে  এবং প্রায় ২০কোটির বেশি  মানুষ  হোয়াটসআপ ব্যবহার করেন।

বিজেপির এক সূত্র  জানিয়েছে, পার্টির  তরফ থেকে  যে সব মানুষ স্মার্ট ফোন ব্যবহার  করেন,  তাদের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। সেই তালিকা  প্রস্তুত হলেই, তা পৌঁছে  যাবে  দিল্লিতে বিজেপির অশোক রোডের  কার্যালয়ে, যেখানে  রয়েছে  বিজেপির তথ্য প্রযুক্তি সেলের সদর দপ্তর।

‘আগামী বছরের নির্বাচন হতে চলেছে হোয়াটসআপ আর ফেসবুকের  নির্বাচন … এবং আমরা তার জন্য  তৈরি’ বলেছেন পশ্চিমবঙ্গের এক বিজেপি নেতা।

এই দাবি শুনে অনেকেই  অবাক হতে পারেন। এই তো  কয়েক বছর আগেও নির্বাচন মানে ছিল বড় বড় মিটিং- মিছিল, সারাদিন  মাইকের অত্যাচার, শহর জুড়ে রাজনৈতিক  দলগুলোর দেয়াল লিখন এবং চারিধারে পোস্টার আর ব্যানার।

মানুষকে নিজেদের দলের আরও কাছে টানার লক্ষ্যে, ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো সিনেমার হিরো-হিরোইনদেরও রাজনৈতিক  প্রচারে গত কয়েক বছরে আনতে শুরু করে।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী  মমতা ব্যানার্জি এক ঝাঁক তারকাদের  দলের মনোনয়ন দিয়েছেন গত কয়েক বছরে। সেই তারকারা নির্বাচনী সভায় নাচ-গানের মাধ্যমে ভোটারদের মন জয় করেছেন।

কিন্তু  ইন্টারনেট এবং স্মার্টফোনের বদৌলতে  অনেক কিছুই  বদলে গেছে গত কয়েক বছরে । তাই  বিজেপির সাথে পাল্লা দিয়ে  লড়াই  করার জন্য প্রস্তুতি  নিচ্ছে তৃণমূলের সাইবার সৈনিকবাহিনী।

মমতার তরুণ  ভাইপো অভিষেক, যিনি পার্টির একজন এমপিও বটে, গতমাসে এক কর্মী সভায় বলেন,  পশ্চিমবঙ্গে ৩০ হাজার সাইবার সৈনিকের দল তৈরি  করতে হবে। তৃণমূলের তরফ থেকে এই সাইবার সৈনিক সনাক্তকরণের কাজ চলছে।

‘একই সাথে প্রস্তুত  করা হচ্ছে ভোটের  প্রচারের  জন্য নানা রকমের তথ্যচিত্র, যা ভোটের  আগে মানুষের  স্মার্ট ফোনে হোয়াটসআপের মাধ্যমে পাঠানো  হবে। ফেসবুকে প্রচারের  জন্য প্রস্তুতি  নেওয়া হচ্ছে’ বলে মন্তব্য করেছেন এক তৃণমূল নেতা।

মমতা নিজে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করেন। প্রায় প্রত্যেক দিন তিনি ফেসবুকে পোস্ট দেন বা টুইট করেন। পার্টির নানা অনুষ্ঠানে গিয়ে তিনি পার্টি কর্মীদের বলেন,  বিজেপিকে আটকাতে গেলে নতুন প্রযুক্তি  ব্যবহার  করে মানুষের  কাছে পৌঁছাতে  হবে।

শুধু  তৃণমূল বা বিজেপি  নয়, ভারতের অন্যান্য  রাজনৈতিক দল, যেমন কংগ্রেস বা সিপিএম’ও প্রযুক্তির  ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচার বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

কলকাতার কংগ্রেসের অফিসে এসেছে নতুন কম্পিউটার আর প্রচারের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের হাতে নতুন স্মার্টফোন। সিপিএম বাম মনোভাবাপন্ন প্রযুক্তি সংস্থার কর্মীদের নিয়ে তৈরি করছে টিম।

বিজেপি আর তৃণমূল অনেক খরচ করতে পারে, আমরা গরিব পার্টি, তাই আমরা পার্টি দরদী দের কাজে লাগাতে চাই, বলেন এক সিপিএম নেতা।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার  করার ক্ষেত্রে  রাজনৈতিক  দলগুলো কে সাহায্য  করার জন্য আবার গজিয়ে উঠেছে বেশ কিছু কম্পানি, যারা নির্বাচনের বাজারে চুটিয়ে ব্যবসাও করছে।

‘ভোটারদের নাম,  তাদের ফোন নাম্বার, তাদের আর্থ সামাজিক অবস্থান,  তাদের চাহিদা  এইসব তথ্য যোগাড় করে তাদের কাছে রাজনৈতিক  দলের বার্তা পৌঁছে  দেওয়া একটি জটিল  কাজ … এটাকেই বলে বিগ ডাটা এনালিটিক্স এবং দেশের কিছু কম্পানি  এই কাজ করছ’, বলেছেন  এক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ।

তা ছাড়াও এইসব কম্পানি ফেসবুক  বা টুইটারে নেতা-নেত্রীদের অনুগামী সংখ্যা  বাড়ানোর  ক্ষেত্রে সাহায্য  করেন। কোনো ফেসবুক পোস্ট  বা টুইটারের বার্তাকে ট্রেন্ডিং করানোর জন্যই তারা রাজনৈতিক  দল গুলোকে সাহায্য  করেন।

নির্বাচনের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার বাড়ার সাথে কমেছে সাবেক পদ্ধতি গুলোর ব্যবহার। বিজেপির এক নেতা বলেছেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনে খবরের কাগজ বা টেলিভিশনে বিজ্ঞাপনে যত  খরচ  হয়েছিল,  এবার তার থেকে কম খরচ  করা হবে।

‘ফেসবুক বা হোয়াটসআপের মাধ্যমে আমরা প্রত্যেক  ভোটারের  কাছে পৌঁছে  যেতে পারি … তাদের চাহিদা অনুযায়ী  বার্তা বানাতে পারি। আর এটাই  প্রযুক্তির  সব থেকে বড় উপযোগিতা’, বলেছেন  ওই  নেতা।

তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহারের সাথে সাথে ফেকনিউজ  এর প্রবণতাও বেড়েছে  অনেক। আর তাই তৃণমূলের মতো দলগুলো নির্বাচনে কমিশনকে ফেসবুক,  টুইটার বা হোয়াটসআপের ওপর নজরদারি করার অনুরোধ জানিয়েছে।

‘আমরা আশা করছি, নির্বাচনে কমিশন ফেকনিউজের বিরুদ্ধে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন’, বলেছেন এক তৃণমূল সূত্র।

Comments

comments

Leave a comment

ফেসবুকে আমরা

লেখা পাঠান

আপনিও লিখতে পারেন। হতে পারেন আপনার জেলা কিংবা উপজেলার প্রতিনিধি।

সিভি পাঠান


news@digitalbangla24.com

উপরে